মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২০

শিরোনাম

  ঢাকা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় দৈনিক কালের কথা পত্রিকার জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা,উপজেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আগ্রহী প্রার্থীরা ০১৭০১৭০৩৪৪২ নাম্বারে যোগাযোগ করুন।  

শীতের শীতলপাটি


শীতের  শীতলপাটি

প্রকাশিতঃ বুধবার, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৭   পঠিতঃ 196182


সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার কাশীপুর গ্রাম। পাটির জন্য বিখ্যাত বলে পরিচিতি পেয়েছে পাটিপল্লি বলে। গ্রামের পাশ দিয়েই এঁকেবেঁকে চলে গেছে একটা খাল। সে খাল পাড়ের পাটিপল্লিতে গিয়েছিলাম ১৯ ডিসেম্বর। ঘুরতে ঘুরতে দেখা মিলল শীতলপাটি বুননের কর্মযজ্ঞ। বুননকর্মীদের কাছে জানা গেল নানা কথা। সে কথায় ফুটে উঠল অতীত ঐতিহ্যের গর্ব

কাশীপুর গ্রামের আবদুল জলিল। ৪৭ বছর বয়সের এই পাটিশিল্পী তখন বেতের কাজ করছিলেন। তিনি বললেন, শীতলপাটি বুননের কাঁচামাল হচ্ছে মুরতা বেত। যেটা শুষ্ক মৌসুমে রোপণ করা হয়। বেত পরিপক্ব হলে বর্ষার পানিতে ভিজিয়ে পাটি তৈরির উপযোগী বেতে রূপ দেওয়া হয়। এরপর চলে পাটি বুনন

কাশীপুর গ্রামে এখন ১৫টি পরিবার শীতলপাটি বুননের সঙ্গে জড়িত। পরিবারের গৃহিণীরাই মূলত পাটি বোনার কাজটি করেন। পুরুষেরা কেবল মুরতা সংগ্রহের বিষয়টি দেখভাল করে থাকেন। তাঁদের এ পেশা চলে এসেছে বংশপরম্পরা

উঠান ধরে এগিয়ে যাই অন্য বাড়িতে। দেখা সুন্দরী বিবি, রীনা বেগম রায়না বেগমের সঙ্গে। এই তিন নারীই বুননকর্মী। ষাট বছর বয়সী সুন্দরীর কাছে জানা গেল শীতলপাটির দাম। একটি শীতলপাটির দাম হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। তবে ফরমাশ দিয়ে পছন্দমতো পাটি তৈরি করাতে আরও বেশি খরচ হয়

১৫ বছর ধরে পাটি বোনেন রীনা বেগম। পাটি বানানোর প্রক্রিয়া শোনালেন এই শিল্পী। পাটি কোমল ও মিহি করতে বেতগুলো সেদ্ধ করে নিতে হয়। এ ছাড়া পাটিতে নকশা ফুটিয়ে তুলতে হলে রং করতে হয়। এভাবে মাপ ও নকশাভেদে একেকটা পাটি তৈরি করতে তাঁর ১৫ থেকে ২০ দিন, এমনকি পাঁচ থেকে ছয় মাসও সময় লাগে। রায়না জানালেন, শীতলপাটি তৈরির প্রক্রিয়াটি সময় ও শ্রমসাপেক্ষ। একটি ৪ হাত বাই ৫ হাত পাটি তৈরিতে কমপক্ষে ১৬০টি মুরতা বেতের প্রয়োজন পড়ে। এসব বেতের মূল্য পড়ে প্রায় ২৫০ টাকা। এর বাইরে রং বাবদ আরও খরচ পড়ে ২৮০ টাকা। পরিবহন খরচসহ সব মিলিয়ে একেকটি পাটি তৈরিতে যে পরিমাণ খরচ হয়, তা বিক্রি করে লাভ খুব কমই হয়। চলতি বছর তিনি ২৫টি পাটি বুনন করেছেন বলে জানালেন

শীতলপাটি নিপুণ হাতের বুননে মুরতা নামে একধরনের ঝোপজাতীয় গাছের বেত দিয়ে তৈরি হয়। গ্রীষ্মকালে শীতল পরশের জন্য বেড়ে যায় শীতলপাটির কদর। পাটির সঙ্গে ‘শীতল’ নামকরণের মাহাত্ম্য এখানেই। এটি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্প। সিলেটের বালাগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা মূলত এ শিল্পের আদি স্থান। এর বাইরে সিলেটের গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ছাড়াও সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, জগন্নাথপুর; হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এবং মৌলভীবাজারের বড়লেখা, রাজনগরসহ সিলেট বিভাগের চার জেলার দুই শতাধিক গ্রামে শীতলপাটি বুননের সঙ্গে কয়েক সহস্রাধিক পরিবার যুক্ত রয়েছে। যুগ যুগ ধরেই বংশপরম্পরায় এসব গ্রামের নারী-পুরুষেরা এই কাজ করেন

শীতলপাটির বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে গরমে ঠান্ডা অনুভূত হয়। প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হওয়ার কারণে এই পাটি একেবারেই স্বাস্থ্যসম্মত। সিলেটের চার জেলা ছাড়াও নোয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় শীতলপাটির কারিগরদের দেখা মেলে। তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাটি তৈরি হলেও সিলেটেই বুননশিল্পীদের দেখা বেশি মেলে। এখানে বুননশিল্পীরা বংশপরম্পরায় পাটির বুননকৌশল আয়ত্ত করেছেন

শীতলপাটির রয়েছে নানা নাম আর জাত। এর মধ্যে ‘পয়সা’, ‘সিকি’, ‘আধুলি’, ‘টাকা’, ‘নয়নতারা’, ‘আসমান তারা’, ‘শাপলা’, ‘সোনামুড়ি’, ‘টিক্কা’ নামের পাটির ব্যবহার গ্রামের গৃহস্থ পরিবারে বেশি। এ ছাড়া অভিজাত পাটি হিসেবে ‘লালগালিচা’, ‘ধাধুলি’, ‘মিহি’ চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করা হয়। বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ১০ হাজার টাকায়। ‘সিকি’ পাটি খুবই মসৃণ হয়। কথিত আছে, মসৃণতার কারণে সিকির ওপর দিয়ে সাপ চলাচল করতে পারে না। এসবের বাইরে দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী নানা ধরনের পাটি রয়েছে। বুননের মাধ্যমে পাটিতে পৌরাণিক কাহিনিচিত্র, পাখি, ফুল-লতা-পাতা বা অন্যান্য জ্যামিতিক নকশা ও মোটিফ তুলে ধরা হয়। পাটিগুলো সচরাচর ৭ X ৫ ফুট হয়ে থাকে

 

কালেরকথা/বিডি

মন্তব্য করুন

Logo

সম্পাদক: মাসুম বিল্লাহ কাওছারী

সিডরো মিডিয়া গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে রিনা দাশ কর্তৃক উত্তরা রেসিডেন্সিয়াল এলাকা ঢাকা থেকে প্রকাশিত

 01701703442   ||   info@dailykalerkotha.com