শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২০

শিরোনাম

  ঢাকা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় দৈনিক কালের কথা পত্রিকার জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা,উপজেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আগ্রহী প্রার্থীরা ০১৭০১৭০৩৪৪২ নাম্বারে যোগাযোগ করুন।  

সুফী তত্ত্ব ও সমকালীন ভাবনা: মাসুম বিল্লাহ কাওছারী


সুফী তত্ত্ব ও সমকালীন ভাবনা: মাসুম বিল্লাহ কাওছারী

প্রকাশিতঃ শনিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২০   পঠিতঃ 6804


: : মাসুম বিল্লাহ কাওছারী ::

আমরা লক্ষ্য করলে দেখবো গোটা দুনিয়া জুড়ে  সকল প্রান্তেই মহান ইসলাম ধর্মের অনুসারী  কম বেশী রয়েছে। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা:) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে আরবের মক্কায় অভিজাত কোরাইশ বংশে   জন্মগ্রহণ করেন। ৫৭০ থেকে ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র ৬৩ বছর মহান আল্লাহর প্রেরিত শেষ নবী এই পৃথিবীতে বেঁচেছিলেন। নবী মুহাম্মদ ৪০ বছর বয়সে আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হয়ে ঐশী প্রেরণায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট থেকে নবুয়ত লাভ করেন। নবুয়াত লাভের পর তিনি আল্লাহ রাব্বুলালামিনের নির্দেশনা মোতাবেক হাজারো প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে মহান আল্লাহর উলুহিয়াত ও রুবুবিয়াত প্রচারে সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেন।  এরপর তিনি ইসলামের স্বার্থে আল্লাহর হুকুমে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরাত করেন এবং ১০ সহস্রাধিক অনুসারী নিয়ে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে তিনি ইসলামের সর্বোচ্চ বিজয় লাভ করেন।
মুহম্মদের নবুয়তি জীবন ছিল মাত্র ২৩ বছর, এর মধ্যে অনুসারীদের জন্য তিনি একটি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক, ধর্মীয় জীবন বিধান হিসেবে মহান আল্লাহর কাছ থেকে পবিত্র কুরআনুল করিমকে রেখে গেছেন।   প্রায় সকল ঐতিহাসিক এবং গবেষকগণ এই বিষয়ে ঐক্যমত যে, পুরো মানবজাতির ইতিহাসে এত অল্প সময়ের জীবনের  সকল পর্যায়ে অনুসারীদের প্রভাবিত করার দ্বিতীয় নজির আর পাওয়া যায় না।
তাঁর প্রদর্শিত পথ ধরেই পরবর্তীতে তাঁর ৪ জন অনুসারী– যাঁরা ইসলামে ৪ খলিফা হিসেবে অধিক পরিচিত– হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), হজরত উমর বিন খাত্তাব (রাঃ), হজরত উসমান (রাঃ)  ও হজরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) পযায়ক্রমে  প্রায় ৩০ বছর ইসলাম ধর্মীয় খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। 

ধর্মবেত্তাদের মতে, রাসুলের (সা:) জীবদ্দশাতেই মসজিদে নববীতে একদল সংসার বিবাগী সাহাবী  নবী মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা:) এর কাছ থেকে জ্ঞানলাভ  ও ধর্মীয় উপদেশ গ্রহণ করতেন এবং সারাক্ষন আল্লাহর জিকির আজকারে র সাথে সাথে আত্ম দর্শন নিয়ে সদা সর্বদা মত্ত থাকতেন। তাঁরা সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। তাদেরকে ‘আহলে সুফফা’ বলে সম্বোধন করা হত। পরবর্তীতে এদেরকে সুফী বলেই সম্বোধন করা হতো। 

উইকিপিডিয়ায় সুফিদের সংজ্ঞা এভাবে- সুফিবাদ বা তাসাউফ , (আরবি: الْتَّصَوُّف‎, ব্যক্তিবাচক বিশেষ্য: صُوفِيّ‎, সুফি, مُتَصَوِّف‎ মুতাসাউইফ) যাকে বিভিন্নভাবে ইসলামী আধ্যাত্মবাদ, ইসলামের অন্তর্নিহিত রূপ, ইসলামের অন্তর্গত আধ্যাত্মিকতার অদৃশ্য অনুভূতি হিসেবেও সংজ্ঞায়িত করা হয়, তা হল ইসলামে আধ্যাত্মবাদ, যা নির্দিষ্ট মুল্যবোধ, আচার-প্রথা চর্চা, মূলনীতি দ্বারা বিশেষায়িত, যা ইসলামের ইতিহাসের খুব প্রাথমিক দিকে শুরু হয়েছিল, এবং এটি ইসলামের আধ্যাত্মিক চর্চার "প্রধান অভিব্যক্তি ও কেন্দ্রীয় স্বচ্ছতা"কে তুলে ধরে।  সুফিবাদের চর্চাকারীদের "সুফি" বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে (আরবি বহুবচন: صُوفِيَّة‎ সুফিয়াহ; صُوفِيُّون‎ সুফিয়ুন; مُتَصَوُّفََة‎ মুতাসায়িফাহ; مُتَصَوُّفُون‎ মুতাসায়িফুন)। ইসলামে তাসাউফের আরেকটি সমার্থক ধারণা হল তাজকিয়া (تزكية)।

ঐতিহাসিকভাবে, সুফিগণ প্রায়শই বিভিন্ন তরিকা বা ধারার অনুসারী - এমন কিছু ধর্মসভা যা কোন মহান শিক্ষাগুরুকে কেন্দ্র করে গঠিত, যাদের ওয়ালী বলে আখ্যায়িত করা হয়, এবং তারা আনুসারীদের সঙ্গে ইসলামী নবী মুহাম্মাদ(স)-এর সরাসরি সংযোগ বা সিলসিলা স্থাপন করেন। এই তরিকাগুলো জাওয়াবিয়া, খানকা বা তেক্কে নামক কোন নির্দিষ্ট স্থানে মজলিস নামক আধ্যাত্মিক বৈঠকে মিলিত হয়[৫] তারা ইহসানের (ইবাদতের পূর্নাঙ্গতা) জন্য সংগ্রাম করে, যা একটি হাদীসে বিস্তারিত বর্নিত আছে: "ইহসান হল এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত কর যে, তুমি তাকে দেখছো, অথবা তুমি তাকে না দেখলেও নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে দেখছেন।" সূফিগণ মুহাম্মদ -কে আল-ইনসান আল-কামিল (প্রথম ব্যক্তি যিনি আল্লাহর নৈতিকতাকে পরিপূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করেছেন) বলে আখ্যায়িত করে থাকে, এবং তাকে নেতা ও প্রধান আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখে।

সকল সূফি তরিকা মুহাম্মদ এর কাছ থেকে পাওয়া তাদের অধিকাংশ অনুশাসন তার চাচাতো ভাই ও জামাতা আলীর বরাতে গ্রহণ করে থাকে, এবং তাকে উল্লেখযোগ্য আলাদা ও বিশেষ ব্যক্তি মনে করে।

যদিও প্রাচীন ও আধুনিক সূফিদের সিংহভাগই ছিল সুন্নি ইসলামের অনুসারী, মধ্যযুগের শেষভাগে শিয়া ইসলাম পরিমন্ডলের ভেতরেও কিছু সুফি ধারার বিকাশ ঘটে। যদিও সুফিগণ কট্টর রীতিনীতির বিরোধী, তারপরও তারা ইসলামী আইন কঠোরভাবে মেনে চলে এবং তারা ইসলামী ফিকহ ও ধর্মতত্ত্বের বিভিন্ন ধারার অন্তর্ভূক্ত। 

ইসলামে সুফি দর্শনের তাত্ত্বিক বিষয়গুলো আস্তে আস্তে তৈরি হয় যা নিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে, রয়েছে বিতর্কও। অনেক গবেষক মনে করেন, হজরত আলী ইবনে তালিব (রা:), সাহাবী আবু জর গিফারি, সাহাবী সালমান ফার্সিসহ আরও কয়েকজন সাহাবী হলেন প্রথম সুফি সাধক। এঁদের মধ্যে হজরত আলী (রা:) শীর্ষ স্থানীয় সুফী।  তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য, উপদেশ সকল সুফি সাধক শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করেন। প্রকৃত পক্ষে হজরত আলী (রা:) কেই  তাত্ত্বিকতায় প্রথম সুফি সাধক হিসেবে শ্রদ্ধা ও সম্মান করা হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ে হজরত রাবেয়া বসরী, হাসান বসরী, ইবরাহিম ইবনে আদম, মনসুর হাল্লাজ, জুনায়েদ বোগদাদী, বায়েজিদ বোস্তামী, মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবীকে মূল্যায়ন করা হয়।
“স্বর্গীয় গুণাবলী মানুষের জ্ঞানের বাইরে। সমগ্র বিশ্বব্রক্ষাণ্ড হল ঐশ্বরিক নির্যাসের বহিপ্রকাশ। তদুপরি এ সকল গুণাবলী কেবল স্রষ্টার সৃষ্টির মহত্ত্ব প্রকাশ করে অর্থাৎ একের মধ্য দিয়ে বহুর প্রকাশ ঘটে।”

“বিশ্বজগতে বহুর মাঝে একক অস্তিত্বের প্রকাশ, আর এটি হল ‘ফানা’র প্রকাশ যার মাধ্যমে ব্যক্তির নিজস্বতার বিলোপ সাধন বুঝায় এবং সে পরবর্তীতে নির্দিষ্ট ঐক্য তথা ‘বাকা’র দিকে ধাবিত হয়। ফলশ্রুতিতে একজন এ বিশ্বকে একক বা বহু– দুভাবেই দেখে, একইসঙ্গে আল্লাহকে স্রষ্টা এবং নিজেকে তাঁর সৃষ্টিরূপে দেখতে পায়।”
তৃতীয় পর্যায়ে, আবদুল কাদের জিলানী, মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন নকশবন্দী, শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী, মঈনুদ্দীন চিশতি, শেখ আহমদ ইবনে মুহাম্মদ তিজানি, ইমাম গাজ্জালি, জালালুদ্দিন রুমী, আবদুল করিম ইবরাহিম আল জীলী প্রমুখ সুফি সাধকের উল্লেখ করা হয়।
ভারতবর্ষে ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণকারী সৈয়দ আহমদ সিরহিন্দকে মুসলিম সাধকদের মধ্যে সুফি দর্শনের জন্য গবেষকগণ উচ্চ মর্যাদা প্রদান করেন। তাঁর অবস্থান ছিল মোঘল সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে। ইসলামের সুফি দর্শনের ক্ষেত্রে সিরহিন্দের উল্লেখযোগ্য অবদান হল ইবনুল আরাবির সর্বেশ্বরবাদী ‘ওয়াহিদুল উযুদ’ তত্ত্বের বাইরে ‘ওয়াহাদাতুশ শুহুদ’ তত্ত্ব প্রদান। সৈয়দ আহমদ সিরহিন্দ তাঁর তত্ত্বের মাধ্যমে বলার চেষ্টা করেছেন, আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে যে ঐক্য সেটি সম্পূর্ণ আত্মগত বা সুনির্দিষ্ট বিষয়কেন্দ্রিক। এটি শুধুমাত্র বিশ্বাসীর অন্তরে অনুভূত হয়, যার বস্তুগত উপস্থিতি নেই। বিশ্বাসী যখন ফানা-ফিল্লাহর স্তরে উপনীত হয় তখন সে এটি অনুভব করতে পারে। (চলবে)

লেখকঃ সম্পাদক দৈনিক কালের কথা ও নির্বাহী পরিচালক,SEDRO

কালেরকথা/বিডি

মন্তব্য করুন

Logo

সম্পাদক: মাসুম বিল্লাহ কাওছারী

সিডরো মিডিয়া গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে রিনা দাশ কর্তৃক উত্তরা রেসিডেন্সিয়াল এলাকা ঢাকা থেকে প্রকাশিত

 01701703442   ||   info@dailykalerkotha.com