মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২০

শিরোনাম

  ঢাকা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় দৈনিক কালের কথা পত্রিকার জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা,উপজেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আগ্রহী প্রার্থীরা ০১৭০১৭০৩৪৪২ নাম্বারে যোগাযোগ করুন।  

মানবতার ফেরিওলা স্যার ফজলে হাসান আবেদ:অধ্যাপক গৌরাঙ্গ মোহন দাস


মানবতার ফেরিওলা স্যার ফজলে হাসান আবেদ:অধ্যাপক গৌরাঙ্গ মোহন দাস

প্রকাশিতঃ শনিবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৯   পঠিতঃ 157626


:: অধ্যাপক গৌরাঙ্গ মোহন দাস ::

মহাপ্রাণ কর্মবীর দূরদর্শী স্বছ চিন্তার মানুষ মানবতার প্রতিমূর্তি কিংবদন্তি স্যার ফজলে হাসান আবেদের মহাপ্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি:

‘গভীর শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় দিলাম বিদায় স্যার ফজলে হাসান,
চলে গেছো অন্যলোকে তবু তোমার সৃষ্টির মাঝে রবেচির অম্লান!’

Image may contain: 1 person


বাংলাদেশের উন্নয়নের পালাবদলের অন্যতম পথদ্রষ্টা, ব্রাকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ,প্রচারবিমুখ,নিভৃতচারী,উন্নত স্বদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, নিরহঙ্কার কর্মবীর স্যার ফজলে হাসান আবেদ চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ৮৩ বছর বয়সে গত ২০ ডিসেম্বর, ২০১৯ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।  বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্বের উন্নয়নচিন্তার অন্যতম পথপ্রদর্শক স্যার ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে বেদনাহত ও শোকাহত। 


স্যার ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য রাষ্ট্রনায়ক, উন্নয়ণকর্মী, নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এবং অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। 
ফজলে হাসান আবেদ ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তিনি বৃটেনে চাটার্ড এ্যাকাউন্টিংয়ে ডিগ্রি নিয়ে কিছুকাল বৃটেনে থাকার পর ১৯৬৮ সালে দেশে ফিরে চট্টগ্রামে একটি কোম্পানিতে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে এলো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। তিনি তখন বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগ দিয়ে ভোলার বিপন্ন দ্বীপ মনপুরায় ত্রাণকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আমরা মনে করি সেদিনের এই ত্রাণসেবা থেকেই ‘ব্র্যাক’-এর বীজ অঙ্কুরিত হয়।

Image may contain: 6 people, including Masum Bellah, people smiling

প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি---সরকারী কলেজে অধ্যাপনা শেষে অবসর গ্রহনের পর ২০১০ সালের ফেব্রæয়ারীতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ও হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশানালের যৌথ প্রকল্প "ফুড সিকিউরিটি এন্ড নিউট্রেশন সার্ভিল্যান্স প্রজেক্ট" (FSNSP)-তে  ‘গ্রাণ্টস কোঅর্ডিনেটর’ পদে যোগদানের জন্য আমার ডাক পড়ে। আমি যথারীতি ঐ পদে যোগদান করে প্রায় একবছর সেখানে কাজের সুবাদে অনুধাবন করেছিলাম যে ‘ব্র্যাক ও স্যার ফজলে হাসান আবেদ ছিলেন সমার্থক’। ‘ব্র্যাক সেন্টারে’ একটি সভায় তাঁর কথা শুনে উপলব্ধি করেছিলাম যে তিনি ছিলেন এক পরশমণি। ব্র্যাক কর্মীরা তাঁর সংস্পর্শে এসে বিমুগ্ধ হয়েছে, অনুপ্রাণিত হয়েছে। আবেদ ভাই নিজেই ছিলেন এক বিশাল জ্ঞানের  ভান্ডার। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, রাজনীতি, উন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর ছিল অগাধ পান্ডিত্ব। তিনি ছিলেন একটি লিভিং এনসাইক্লোপিডিয়া। বহুমুখী প্রতিভায় স্যার আবেদ ছিলেন এক অদ্বিতীয় মহীরুহ।

Image may contain: 1 person
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশমাতৃকার মুক্তির আহবানে নিজেকে তিনি  দেশের মুক্তিসংগ্রামে যুক্ত করেন। যুদ্ধের প্রারম্ভে তিনি বৃটেনে চলে যান এবং ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তহবিল সংগ্রহ করেন ও জনমত গঠন করেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে ‘আ্যাকশন বাংলাদেশ’ ও ‘হেল্প বাংলাদেশ’ নামে দু’টি সংগঠন থেকে ১৯৭২ সালে ‘ব্র্যাক’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে এর পূর্ণ নাম ছিল ‘রিহ্যাবিলিটেশন আ্যসিস্ট্যান্ট কমিটি’ এবং এর প্রথম কার্যক্রম ছিল--দেশ থেকে যেসব মানুষ যুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাঁদের ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে তিনি কাজ শুরু করেন। তখন থেকেই মূলতঃ ব্র্যাকের যাত্রা শুরু। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য ১৬০০০ ঘর করে দিয়েছিলেন। আবেদ ভাই এর পর ব্র্যাকের কার্যক্রম বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যান এবং প্রতিষ্ঠানের নামের অর্থ বদলে যায়। ব্র্যাকের নতুন নাম হয় : বাংলাদেশ রিসোর্স এক্রোস কমিটি। স্যার ফজলে হাসান আবেদের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক এখন দেশের সীমা ছাড়িয়ে এশিয়ায় ও আফ্রিকায় ১১টি দেশে ১২০ কোটি মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ব্র্যাকে বর্তমান কর্মীসংখ্যা ১ লাখ। 

Image may contain: one or more people and people standing


যাহোক, ঝড়-বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পুনর্বাসনের জন্য ব্র্যাক আরও নানা পরিসরে কাজ শুরু করে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ওরাল স্যালাইন নিয়ে কাজ। ‘আইসিডিডিআরবি’ ডাইয়েরিয়া নিরাময়ের ‘ওরাল স্যালাইন’ উদ্ভাবনের পর সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে সেটা তৃণমূল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। সেই চ্যালেঞ্জটাই নেয় ব্র্যাক। সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের মধ্যে ওরাল স্যালাইন জনপ্রিয় করার কাজটি ব্র্যাকই করেছে।


ব্র্যাকের অন্যতম সাফল্য হলো নন-ফরমাল শিক্ষাপদ্ধতি চালু করা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠির শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনার জন্য গ্রামে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করার ভাবনাটাও আবেদ ভাইয়ের মাথা থেকে এসেছিল। একটি মাত্র ক্লাসরুম আর একজন মাত্র শিক্ষিকার মাধ্যমে শিক্ষাদান করে অনন্য এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন গোটা বিশ্বেই। অধুনা বিশ্বে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে আবেদ ভাইয়ের অবদান সবচেয়ে বড়। সারা বিশ্বে ব্র্যাকের যত কর্মী আছেন, তাঁদের ৭০ ভাগই নারী। এ কাজটা কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না। কয়েকটি গোঁড়া গোষ্ঠি সে সময় মাঠে নেমে গিয়েছিল।কিন্তু আবেদ ভাই তাতে বিচলিত হয়ে পিছিয়ে আসেননি। আজ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যে নারী স্বাধীনতা, নারী অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ণ অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এর পিছনে আবেদ ভাইয়ের দূরদর্শী চিন্তা বড় ভূমিকা পালন করেছে। ফজলে হাসান আবেদ বিশ্বাস করতেন-- মানুষ অমিত শক্তির অধিকারী। সামান্য সুযোগ পেলে সে নিজেই নিজের ভাগ্য বদলাতে পারে।


২০০১ সালে বুয়েটের প্রথিতযশা শিক্ষক ও জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়’। আজ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করছে এবং দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করছে। আবেদ ভাইয়ের দূরদর্শী  ভাবনা ও পরিকল্পনা কখনো বিফলে যায়নি। তিনি নিজের অর্থবিত্ত নিয়ে কখনো ভাবেননি। বাস করেছেন প্রতিষ্ঠানের বাসায়। নিজের জন্য বাড়ি-গাড়ি, শান-শওকত করেননি। তাঁর চিন্তা ছিল অত্যন্ত স্ব”ছ। ব্র্যাক প্রতিষ্ঠার পেছনেও তাঁর আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়ার চিন্তা ছিল না কোনোদিন। তাঁর ‘ব্র্যাক ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা মূলতঃ ব্যাংকিং সেবাকে নিয়ে আয়ের মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেয়। 

abed
আবেদ ভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাকের আওতায় আছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক ব্যাংক, বিকাশ, আড়ং, ব্র্যাক ডেইরী, ব্র্যাক প্রিন্টিং, ব্র্যাক ফিশারিজ,ব্র্যাক নার্সাারী, ব্র্যাক স্যানিটারি ন্যাপকিন এন্ড ডেলিভারি কিট, ব্র্যাক সিড ইত্যাদি।বিদেশী সংগঠনগুলো সততা ও স্ব”ছতার কারণেই  স্যার ফজলে হাসান আবেদকে পছন্দ করতো। তাই অনুদান প্রদানের ক্ষেত্রে ব্র্যাকই ছিল তাঁদের পছন্দের তালিকায় প্রথম দিকে। শুরুর দিকে বিদেশী অনুদানের মাধ্যমেই ব্র্যাক তার সমাজ সেবামূলক কার্যক্রম গুলো পরিচালনা করেছে। বিকাশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ব্র্যাক এখন স্বাবলম্বী। বিকাশের লভ্যাংশের বড় অংশ ব্যয় হয় ব্র্যাকের অলাভজনক কার্যক্রমে। 


তিনি দেশে-বিদেশে যেসব পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: র‌্যামন ম্যাগসাইসাই (১৯৮০), ব্র্যাকের স্বাধীনতা পুরস্কার (২০০৭), দারিদ্র বিমোচনে অসাধারণ অবদানের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে সম্মানজনক ‘নাইটহুড’ (২০১০), শিক্ষায় অবদানের জন্য ‘ইয়াইদান’ পুরস্কার ও স্বর্ণ পদক (২০১৯)।


নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এক শোকবার্তায় বলেছেন,‘ফজলে হাসান আবেদ আমাদের সময়ের কাজ ও চিন্তার অগ্রসর নেতা। তিনি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বকে বদলে ফেলার কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।’ পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁর মতো মানুষ বিরল বলেও তিনি মনে করেন। নোবেলজয়ী আরো দুই অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায় ও এস্তার দুফলো তাঁদের দেওয়া শোকবার্তায় বলেছেন,‘ফজলে হাসান আবেদের মতো মানুষ কয়টা হয? তাঁর অবর্তমানে আমরা একটু ছোট হয়ে গেলাম।’


মৃত্যু সন্নিকটে জেনে তিনি যে দূরদর্শিতায় ব্র্যাকের নেতৃত্ব পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন, বাংলাদেশে এবং সমগ্র বিশ্বে তা এক ব্যতিক্রমী নজির হয়ে থাকবে। আবেদ ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু  তিনি শুধু তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নয়,--বাংলাদেশ ও বিশ্বের সুবিধাবঞ্চিত কোটি কোটি মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকবেন আর গত ৪৮ বছরে বাংলাদেশের সব অর্জন ও সাফল্যের স্মৃতির সাথে যুক্ত থেকে তাঁদের প্রেরণা জোগাবেন অনন্তকাল।                    

 

 

কালেরকথা/বিডি

মন্তব্য করুন

Logo

সম্পাদক: মাসুম বিল্লাহ কাওছারী

সিডরো মিডিয়া গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স লিঃ-এর পক্ষে রিনা দাশ কর্তৃক উত্তরা রেসিডেন্সিয়াল এলাকা ঢাকা থেকে প্রকাশিত

 01701703442   ||   info@dailykalerkotha.com